April 25, 2026, 9:58 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়-কে ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্ক। এ বির্তক এবার তৈরি হয়েছে একজন মন্ত্রীর বক্তব্যে। গত শুক্রবার আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া” করার পক্ষে মত দেন, তখন অনেকের কাছে বিষয়টি নতুন মনে হলেও—অন্যদের কাছে এটি যেন পুরোনো এক সমস্যার পুনরাবৃত্তির আভাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস, যেখানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে, সেই প্রাঙ্গণই একসময় এই নাম-সংক্রান্ত জটিলতার সাক্ষী ছিল। প্রশাসনিক সীমারেখার বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে অতীতে “ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া” নাম ব্যবহার করা হলেও, এর ফল যে কতটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল—তা আজও অনেকের স্মৃতিতে তাজা।
একসময় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা দূতাবাস থেকে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল চিঠিগুলো প্রায়ই ভুল ঠিকানায় চলে যেত। “ঝিনাইদহ” শব্দটি দেখে অনেকেই ধরে নিতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কার্যালয় সেখানেই অবস্থিত। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথি, আমন্ত্রণপত্র কিংবা একাডেমিক যোগাযোগের কাগজপত্র গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হতো, কখনো কখনো হারিয়েও যেত।
এই ভুল বোঝাবুঝি শুধুমাত্র ডাকবিভাগের সীমাবদ্ধতা ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি প্রশাসনিক সমস্যায় রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেক সময় আলাদা উদ্যোগ নিয়ে সেই চিঠিপত্র উদ্ধার করতে হতো। এতে যেমন সময় নষ্ট হতো, তেমনি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তৈরি হতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।
বর্তমান প্রস্তাব সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সেই পুরোনো অভিজ্ঞতার কথাই স্মরণ করছেন। কেউ লিখেছেন, “যে ভুল একবার হয়েছে, সেটি আবার কেন করা হবে?” আবার কেউ বলছেন, “একটি প্রতিষ্ঠিত নাম পরিবর্তন মানেই নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি করা।”
তবে এই বিতর্কের অন্য দিকও রয়েছে। কিছু মানুষ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য “ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া” নামটি যৌক্তিক হতে পারে। তাদের মতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য এ ধরনের পরিবর্তন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতার প্রশ্নটি এখানেই জটিল হয়ে ওঠে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কেবল তার অবস্থান নির্দেশ করে না; এটি তার পরিচয়, ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও প্রতীক। “কুষ্টিয়া” নামটি ইতোমধ্যেই দেশের ভেতরে এবং বাইরে একটি নির্দিষ্ট পরিচিতি তৈরি করেছে। এই পরিচিতি বদলে দিলে সেটিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে সময় লাগবে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ এই প্রস্তাবকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন, আবার কেউ এটিকে একটি প্রশাসনিক সংশোধন হিসেবে দেখছেন। তবে একটি বড় অংশই মনে করছে, নাম পরিবর্তনের চেয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। যদি কোনো সিদ্ধান্ত আগে বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে, তবে সেটিকে পুনরায় প্রয়োগ করার আগে আরও গভীরভাবে ভাবা জরুরি। বিশেষ করে এমন একটি ক্ষেত্রে, যেখানে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি সরাসরি জড়িত।
এই পুরো বিতর্ক যেন একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—একটি প্রতিষ্ঠানের নাম কতটা গুরুত্বপূর্ণ? উত্তরটি সহজ নয়। কারণ নামের মধ্যে যেমন পরিচয় লুকিয়ে থাকে, তেমনি বাস্তবতার সাথে তার সামঞ্জস্যও সমান জরুরি।
এখানে বাস্তবতা হলো এই প্রস্তাবটি কেবল একটি প্রশাসনিক বা নামকরণ সংক্রান্ত বিষয় নয়; এর ভেতরে রয়েছে ইতিহাস, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
প্রথমত, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই এই বিতর্কের মূল। বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ—দুই জেলার সীমানায় অবস্থিত। ফলে শুরু থেকেই উভয় জেলার মানুষের মধ্যে একটি —অধিকারবোধ তৈরি হয়েছে। কুষ্টিয়াবাসী এটিকে নিজেদের ঐতিহ্য ও গৌরবের অংশ হিসেবে দেখেন, কারণ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। অন্যদিকে, ঝিনাইদহবাসীও যুক্তি দেন যে, ভৌগোলিক বাস্তবতায় তাদের অংশীদারিত্ব অস্বীকার করা যায় না। ফলে নামের সঙ্গে দুই জেলার উল্লেখ—এটি অনেকের কাছে ন্যায্যতার প্রশ্ন, আবার অন্যদের কাছে এটি প্রতিষ্ঠিত পরিচয়কে খণ্ডিত করার প্রচেষ্টা।
দ্বিতীয়ত, এই বিতর্কের একটি রাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়, সেতু বা বড় অবকাঠামোর নামকরণ প্রায়ই রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও প্রভাবের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়। একজন মন্ত্রীর বক্তব্য তাই কেবল ব্যক্তিগত মত নয়, বরং একটি সম্ভাব্য নীতিগত অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হয়। এখানে প্রশ্ন উঠছে—এই প্রস্তাব কি সত্যিই প্রশাসনিক ভারসাম্য আনার উদ্দেশ্যে, নাকি এটি আঞ্চলিক চাপ বা রাজনৈতিক সমীকরণের ফল?
তৃতীয়ত, পরিচয় ও ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া” নামটি ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি স্বীকৃত পরিচিতি পেয়েছে। এই নাম পরিবর্তন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ব্র্যান্ড, গবেষণা পরিচিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা প্রকাশনা এবং র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে নামের ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে হঠাৎ করে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি হিসেবে মনে হচ্ছে।
চতুর্থত, এই বিতর্কের পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে—যা অঞ্চলিক আত্মমর্যাদা বা হিসেবে পরিচিত। কুষ্টিয়া দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে একটি শক্তিশালী পরিচয় বহন করে (লালন, রবীন্দ্রনাথ, ঐতিহাসিক আন্দোলন ইত্যাদির কারণে)। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে কুষ্টিয়ার একক সংযুক্তি অনেকের কাছে সেই ঐতিহ্যের প্রতীক। সেখানে ঝিনাইদহের নাম যুক্ত করার প্রস্তাবকে কেউ কেউ নিজেদের সাংস্কৃতিক অবস্থান ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, যদি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবিক অর্থেই দুই জেলার ওপর বিস্তৃত হয়, তাহলে নামেও সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি দুই জেলার মধ্যে সমন্বয় ও অংশীদারিত্বের বার্তা দিতে পারে। তবে এই যুক্তি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন এটি হবে একটি সুপরিকল্পিত, অংশগ্রহণমূলক এবং সর্বপক্ষের সম্মতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত—-কেবল একতরফা ঘোষণার মাধ্যমে নয়।
সবশেষে বলা যায়, এই বিতর্ক মূলত একটি নামের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্ক, আঞ্চলিক রাজনীতি, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের জটিল সংমিশ্রণ। তাই এই ইস্যু সমাধানের জন্য প্রয়োজন আবেগ নয়, বরং তথ্যভিত্তিক আলোচনা, অংশীজনদের মতামত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। অন্যথায়, এটি বারবার ফিরে আসা এক ‘অসমাপ্ত বিতর্ক’ হিসেবেই রয়ে যাবে।